নটরডেম থেকে ঢাবি কাঁপানো এক বেঙ্গল টাইগার

মুহাম্মদ আশিক সৈকত
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২০, রাত ১১:৩৩

মুহাম্মদ আশিক সৈকতঃ প্রিয় পাঠক, বলতে পারেন ওয়ানডেতে এক পঞ্জিকাবর্ষে বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটার প্রথম এক হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন? আপনার উত্তরটি যদি শাহরিয়ার নাফীস হয়, তাহলে আপনি ১০০% সঠিক উত্তর দিয়েছেন। শাহরিয়ার নাফীসকে বাংলাদেশের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে জানলেও তার কৃতিত্বপূর্ণ একাডেমিক ক্যারিয়ার সম্পর্কে খুব কম মানুষই অবগত আছেন। আজ আমরা সে সম্পর্কেই জানবো। 

শাহরিয়ার নাফীসের জন্ম ১৯৮৫ সালে, ঢাকায়। সামরিক কর্মকর্তা বাবা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পাঠ সম্পন্ন করা মায়ের কোলজুড়ে আসেন তিন ভাইয়ের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ শাহরিয়ার নাফীস ওরফে 'আবির'। উল্লেখ্য, তার মাতামহ ছিলেন ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা একজন গ্রাজুয়েট এবং সাবেক সফল ক্রিকেটার - নির্বাচক ফারুক আহমেদ সম্পর্কে তার খালাতো ভাই। অর্থাৎ, পড়াশোনা এবং খেলাধুলার ঐতিহ্যের ধারা তিনি যে বংশানুক্রমেই পেয়েছিলেন, তা বলাই বাহুল্য।

ছোটবেলা থেকেই তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী নাফীস পড়াশোনায় কখনোই ফাঁকি দিতেন না, তবে খেলার প্রতি দূর্বার টান ছোটবেলা থেকেই ছিল। ক্রিকেট  খেলার প্রতি প্যাশন এতটাই ছিল যে ক্যাডেট কলেজ এবং সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল- দুটোতেই চান্স পাওয়ার পরও শুধুমাত্র নির্বিঘ্নে ক্রিকেট খেলা যাবে এই ভেবে সেন্ট যোসেফকে বেছে নেন। ক্রিকেটের প্রতি এই নিখাঁদ ভালবাসার প্রতিদান পেতে কিন্তু খুব বেশি দেরি হয়নি। সেন্ট যোসেফে থাকা অবস্থায়ই অনুর্ধ্ব ১৫ ক্রিকেট ট্যুর্নামেন্ট খেলতে যান মালয়েশিয়া। ২০০১ সালে সেন্ট যোসেফ স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করার পর ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চান্স পান দেশের স্বনামধন্য কলেজ নটরডেম কলেজে। সেখানে ভর্তি হওয়ার পর কঠিন নিয়মকানুন, পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেটটাও সমান তালে চালিয়ে গেছেন, কলেজ ক্রিকেট টিমেও খেলেছেন।

২০০৩ সাল। এইচএসসি পরীক্ষার আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। হঠাৎ করে খবর আসলো শাহরিয়ার নাফিস বয়সভিত্তিক দলের আসন্ন শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। দেড় মাসের সফর। এত লম্বা সময়ের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাড় দিবে কিনা, তা নিয়ে পরিবার খুব দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যায়। অবশেষে তার মা একটা দরখাস্ত নিয়ে কলেজের প্রিন্সিপাল (ফাদার) এর সাথে দেখা করলে তিনি শর্ত সাপেক্ষে  ছুটি মঞ্জুর করেন। 

মোটামুটি সফল একটি সফর কাটিয়ে তিনি যখন বাংলাদেশে ফিরলেন, তখন এইচএসসি পরীক্ষার বাকি আর মাত্র দুই মাস। বাসায় ফিরে এইচএসসির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা শুরু করলেন। অবশেষে পরীক্ষা ঘনিয়ে এলো, যথাসময়ে বসলেন পরীক্ষায়। বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর এবার রেজাল্ট দেওয়ার পালা। মাকে নিয়ে দুরুদুরু বুকে হাজির হলেন কলেজ প্রাঙ্গণে। বেলা ৪ টায় রেজাল্ট পেলেন, জিপিএ ৪.৪০ (সেসময় ৪র্থ বিষয় যোগ হয়নি)। ব্যবসা শিক্ষা বিভাগ থেকে এই রেজাল্ট  করা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। খুশিমনে রেজাল্ট নিয়ে জাতীয় স্টেডিয়ামে গিয়ে খবর পেলেন, আসন্ন পাকিস্তান সফরের ১৫ জনের দলে আছেন তিনি। একদিনে দু দুটো খুশির খবর নিয়ে বাসায় ফেরেন সেদিন। 

ছোটবেলা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুপ্ত বাসনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য তখন উদগ্রীব শাহরিয়ার নাফীস। ভর্তি হলেন ইউসিসির ফার্মগেট শাখায়। ৩,০০০ টাকা দিয়ে ভর্তি হয়ে ক্লাস করেন মাত্র ৩ দিন! এরপরই চলে যান বিকেএসপির ক্যাম্পে। এদিকে তার মা দাঁতে দাঁত চেপে সর্বদা আল্লাহকে ডাকতেন আর তাকে বারবার বলতেন, "আবির, যত যাই বলো, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সাধ্য কিন্তু আমাদের নেই। সেই মোতাবেক পড়াশোনা করো।" 

কুরবানি ঈদের কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'সি' ইউনিট এর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। দ্রুতই রেজাল্ট পাবলিশ হওয়ার পর দেখা গেল শাহরিয়ার নাফীস লিখিততে উত্তীর্ণ হয়েছেন। রেজাল্ট এর খবর প্রথম জানতে পারেন তা মা। এডমিট কার্ড বের করে যখন দেখলেন  ছেলে লিখিততে উত্তীর্ণ হয়েছেন, আনন্দে আটখানা হয়ে চিৎকার দিয়ে ঢুকলেন ছেলের রুমে। ছেলে তখন ঘুমাচ্ছিলেন। আলতো করে মশারি ভেতর মাথা ঢুকিয়ে সানন্দে রেজাল্টের খবর জানালেন। কিন্তু একি! ছেলে একবার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে পাশ ফিরে আবার ঘুম দিলেন। ভাবখানা এমন যেন তিনি আগে থেকেই জানতেন যে লিখিততে উত্তীর্ণ হবেন!

লিখিত পরীক্ষা শেষে এবার মৌখিক পরীক্ষার পালা। মেধাঅনুযায়ী বিষয়-ডিপার্টমেন্ট নির্ধারিত হবে। নাফীস প্রচন্ড ইচ্ছা মার্কেটিং এ পড়ার। পজিশন ৪০০ এর ভেতরই। তবুও নিশ্চিন্তে স্থির হতে পারছেননা তিনি। অস্থির ছেলেকে শান্তনা দিয়ে মা বললেন, "তুমি মার্কেটিংই পাবে।" পরবর্তীতে তিনি সত্যিই মার্কেটিং এ ভর্তি হয়েছিলেন এবং এ বিষয়েই স্নাতক সম্পন্ন করেন। 

২০০৫ সালে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো এই ক্রিকেটার সর্বশেষ জাতীয় দলে খেলেছেন ২০১৩ সালে। এ পর্যন্ত ২৪ টেস্টে তার সংগ্রহ ২৬.৩৯ গড়ে ১,২৬৭ রান (শতক ১ টি, অর্ধশতক ৭ টি)। ৭৫ টি ওয়ানডেতে তিনি করেছেন ৩১.৪৪ গড়ে ২,২০১ রান (শতক ৪ টি, অর্ধশতক ১৩ টি)। এছাড়া ক্যারিয়ারের একমাত্র আন্তর্জাতিক টি টুয়েন্টি খেলেছেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, যে খেলায় তিনি অধিনায়কও ছিলেন। 

২০০৬ সালে তিনি ICC কর্তৃক 'Emerging Player of the Year' এ ভূষিত হওয়ার পাশাপাশি BCB কর্তৃক 'Cricketer of the Year' এ ভূষিত হন। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে সর্বদাই দুর্দান্ত পারফর্ম করে গেছেন। বয়স প্রায় ৩৬ এর কাছাকাছি। মাঠের ক্রিকেট হয়তো খুব বেশিদিন খেলতে পারবেননা। তবে ক্রিকেটই যার ধ্যানজ্ঞান, তিনি কি আর ক্রিকেটের বাইরে থাকতে পারেন? আর তাই তিনি অলরেডি ক্রিকেট এনালিস্ট ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ শুরু করছেন, পাশাপাশি কোচিং এর বিভিন্ন লেভেলও কম্পলিট করছেন। কে জানে, হয়তো ভবিষ্যতে এই মেধাবী মানুষটির হাত ধরেই বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেকদূর এগিয়ে যাবে। শুভকামনা রইল প্রিয় ক্রিকেটার, শাহরিয়ার নাফীস।


ব্যাঙ্গালুরো বনাম চেন্নাই সুপার কিংস
৪৪তম ম্যাচ, দুবাই
২৫ অক্টোবর ২০২০, বিকাল ৪টা
আইপিএল, ২০২০

রাজস্থান রয়েলস বনাম মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স
৪৫তম ম্যাচ, আবুধাবি
২৫ অক্টোবর ২০২০, রাত ৮টা
আইপিএল, ২০২০

পাকিস্তান বনাম জিম্বাবুয়ে
১ম ওয়ানডে, রওয়ালপিন্ডি
৩০ অক্টোবর ২০২০
জিম্বাবুয়ের পাকিস্তান সফর, ২০২০

পাকিস্তান বনাম জিম্বাবুয়ে
২য় ওয়ানডে, রওয়ালপিন্ডি
১ নভেম্বর ২০২০
জিম্বাবুয়ের পাকিস্তান সফর, ২০২০

পাকিস্তান বনাম জিম্বাবুয়ে
৩য় ওয়ানডে, রওয়ালপিন্ডি
৩ নভেম্বর ২০২০
জিম্বাবুয়ের পাকিস্তান সফর, ২০২০

পাকিস্তান বনাম জিম্বাবুয়ে
১ম টি-টুয়েন্টি, রওয়ালপিন্ডি
৭ নভেম্বর ২০২০
জিম্বাবুয়ের পাকিস্তান সফর, ২০২০

সবশেষ ফলাফল [ ফলাফল পাতা ]

কিংস এলিভেন পাঞ্জাব 12 রানে জয়ী।
৪৩তম ম্যাচ, দুবাই
কিংস এলিভেন পাঞ্জাব 126/7 (20.0)
সানরাইজার্স হাইদ্রাবাদ 114/10 (19.5)
২৪ অক্টোবর ২০২০, রাত ৮টা
আইপিএল, ২০২০
কলকাতা 59 রানে জয়ী।
৪২তম ম্যাচ, আবুধাবি
কলকাতা 194/6 (20.0)
দিল্লী ক্যাপিটালস 135/9 (20.0)
২৪ অক্টোবর ২০২০, বিকাল ৪টা
আইপিএল, ২০২০
মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স 10 উইকেটে জয়ী।
৪১তম ম্যাচ, শারজা
চেন্নাই সুপার কিংস 114/9 (20.0)
মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স 116/0 (12.2)
২৩ অক্টোবর ২০২০, রাত ৮টা
আইপিএল, ২০২০
সানরাইজার্স হাইদ্রাবাদ 8 উইকেটে জয়ী।
৪০তম ম্যাচ, দুবাই
রাজস্থান রয়েলস 154/6 (20.0)
সানরাইজার্স হাইদ্রাবাদ 156/2 (18.1)
২২ অক্টোবর ২০২০, রাত ৮টা
আইপিএল, ২০২০
ব্যাঙ্গালুরো 8 উইকেটে জয়ী।
৩৯তম ম্যাচ, আবুধাবি
কলকাতা 84/8 (20.0)
ব্যাঙ্গালুরো 85/2 (13.3)
২১ অক্টোবর ২০২০, রাত ৮টা
আইপিএল, ২০২০
কিংস এলিভেন পাঞ্জাব 5 উইকেটে জয়ী।
৩৮তম ম্যাচ, দুবাই
দিল্লী ক্যাপিটালস 164/5 (20.0)
কিংস এলিভেন পাঞ্জাব 167/5 (19.0)
২০ অক্টোবর ২০২০, রাত ৮টা
আইপিএল, ২০২০