ভুল সময়ে জন্ম নেওয়া এক কিংবদন্তি

মুহাম্মদ আশিক সৈকত
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, দুপুর ১:৪০

মুহাম্মদ আশিক সৈকতঃ হেরাথ মুদিয়ানসেলাগে রঙ্গনা কিরথি বন্দরা হেরাথ, সংক্ষেপে রঙ্গনা হেরাথ। ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার এই বাঁহাতি স্পিন জাদুকরকে চেনেনা, এমন ক্রিকেটপ্রেমী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ক্রিকেটে ভুল সময়ে জন্ম নেওয়া বলে যে আক্ষেপ প্রচলিত আছে, হেরাথ তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের হয়ে ১৯৯৯ সালে টেস্ট অভিষেক হলেও কিংবদন্তি মুত্তিয়া মুরালিধরনের ছায়ায় ঢাকা পড়ে ছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম এগারোটি বছর।

শৈশবে ওপেনার হিসেবে ক্রিকেট শুরু করা হেরাথ একটু বড় হয়ে যখন পেস বোলিং এর দিকে ঝুঁকলেন, তখন খর্বাকৃতির জন্য কোচের পরামর্শে তাকে শখের পেস বোলিং ছেড়ে স্পিনার বনে যেতে হয়। ১৯৯৯ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে গলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক। অভিষেকেই চার উইকেট নিয়ে বাজিমাত করলেও দলে তার জায়গা পাকাপোক্ত ছিলনা। কারণ, শ্রীলঙ্কার স্পিন আক্রমণের মূল কান্ডারিই ছিলেন মুত্তিয়া মুরালিধরন। ঘরের মাঠে যদি কখনো স্পিনিং উইকেট বানানো হতো, তাহলে কালেভদ্রে মুরালির সঙ্গে দ্বিতীয় স্পিনার হিসেবে হেরাথের ডাক পড়তো। 

টেস্টে মাঝেমাঝে দলে সুযোগ পেলেও লংকানদের রঙ্গিন জার্সি গায়ে জড়াতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে পাঁচ পাঁচটি বছর। ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডেতে অভিষেক ঘটে হেরাথের। অভিষেকে ভাল করলেও সেবছর মাত্র পাঁচটি ওয়ানডে খেলে তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কারণ, নির্বাচকদের চোখে অটোমেটিক চয়েজ হিসেবে মুরালির পর দ্বিতীয় পছন্দ ছিল উপুল চন্দনা। তাই হেরাথকে দিনের পর দিন তৃষ্ণার্ত কাকের মতো অপেক্ষায় থাকতে হতো। 

২০০৯ সালের গল টেস্ট, বিপক্ষ পাকিস্তান। মুরালিধরনের অনুপস্থিতিতে প্রধান স্পিনারের দায়িত্ব এসে পড়ে হেরাথের কাঁধে। সুযোগটাকে বেশ ভালভাবে লুফে নেন তিনি, হেরাথের ঘুর্ণিতে ১৬৮ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে মাত্র ১১৭ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। সে ম্যাচে মাত্র ১৫ রানে চার উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন হেরাথ।

২০১০ সালের জুলাই মাস। ভারতের বিপক্ষে কিংবদন্তি মুরালিধরন যখন ৮০০ উইকেট পূর্ণ করে  তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টানেন, হেরাথের বয়স ততদিনে ৩২ পেরিয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কার নির্বাচক প্যানেলের চোখ তখন রহস্যময় স্পিনার অজন্তা মেন্ডিস ও সুরাজ রনদ্বীপের দিকে। তেমন রহস্যময় কোন ডেলিভারি তার ঝুলিতে না থাকলেও অনবরত দীর্ঘক্ষণ একই জায়গায় বল করে যাওয়ার সক্ষমতা দিয়ে খুব দ্রুতই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেন। 

২০১১ সাল। তিন ম্যাচ টেস্ট সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাকি স্পিনাররা যখন মাঠে খাবি খাচ্ছে, ঠিক তখনই সে সিরিজে হেরাথ একাই তুলে নেন ১৬ উইকেট। নির্বাচকদের সুদৃষ্টি বুঝি এবার পড়লো হেরাথের ওপর! ক্যারিয়ার শুরুর প্রায় বার বছর পর দলের মূল স্পিনারের ভূমিকায় এলেন রঙ্গনা হেরাথ! আস্তে আস্তে টেস্টের সীমানা ছাড়িয়ে ওয়ানডেতে নিয়মিত হয়ে উঠতে লাগলেন। এরই মাঝে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হয়ে গেল টি টুয়েন্টি অভিষেক। হেরাথ তখন শ্রীলঙ্কা দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২০১২ সালের মার্চ মাস। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গল টেস্টে ১২ উইকেট তুলে নিয়ে টেস্টে প্রথমবারের মতো দশ উইকেট নেওয়ার গৌরব অর্জন করেন হেরাথ। জুনে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজেও ১৫ উইকেট তুলে নিয়ে নিজের জাত চিনিয়ে যাচ্ছিলেন। এদিকে হঠাৎ ঘরের মাঠে হওয়া টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করে শ্রীলঙ্কা। দুই স্পিনার আকিলা ধনঞ্জয়া ও অজন্তা মেন্ডিসের সঙ্গে স্কোয়াডে ঠাঁই মিলে রঙ্গনা হেরাথের। তবে গ্রুপ পর্ব ও কোয়ার্টার ফাইনালে যেন মাঠে নামারই তেমন সুযোগ হচ্ছিলনা, হঠাৎ করে সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হল তাকে। সর্বদা সুযোগ লুফে নেওয়া হেরাথ সে ম্যাচেও সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন। মাত্র ২৫ রানে ৩ উইকেট নিয়ে দলকে ফাইনালে পৌঁছে দেন। তবে ফাইনালে তার আর খেলা হয়নি, ধনঞ্জয়াকে জায়গা দিতে আবারও সাইডবেঞ্চে ফিরতে হয় তাকে। সে আসরে অবশ্য শ্রীলঙ্কাকে শিরোপা খোয়াতে হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে। 

২০১২ সালের ন্যায় ২০১৪ সালের টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও হেরাথকে শুরুর দিকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখে শ্রীলঙ্কা। তবে সুপার টেনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শোচনীয় হারের পর হেরাথকে দলে নেওয়ার দাবি জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত বাঁচা মরার ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একাদশে জায়গা পান এই অভিজ্ঞ স্পিনার। সে ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ১১৯ রানে শ্রীলঙ্কা গুটিয়ে যাওয়ায় যখন মনে হচ্ছিল কিউইরা হেসেখেলে এই ম্যাচ জিতে নেবে, ঠিক তখনই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন রঙ্গনা হেরাথ। সেদিন ৩.৩ ওভারে রেকর্ড মাত্র ৩ রানে ৫ উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডকে একাই গুঁড়িয়ে দেন তিনি। হেরাথ বীরত্বে সেবার বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তোলে লঙ্কানরা। পাকিস্তানের বিপক্ষে বরাবরই উন্নত পারফরম্যান্স শো করা হেরাথ ২০১৪ সালে কলম্বো টেস্টে পাকদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে তুলে নেন ৯ উইকেট, যা টেস্টে বাঁহাতি বোলারদের সেরা বোলিং ফিগারের রেকর্ড! 

২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ। শ্রীলঙ্কা দলের স্পিন আক্রমণ এর প্রধান সেনা রঙ্গনা হেরাথ। নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান বেশ ভালভাবেই দিচ্ছিলেন। হঠাৎ ছন্দপতন! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে হাতের ইঞ্জুরিতে ছিটকে যান ট্যুরনামেন্ট থেকে, এরইসাথে ওয়ানডে ক্রিকেটে নিজের অবসর ঘোষণা করেন এবং ঠিক পরের বছরই টি টুয়েন্টি থেকেও অবসর নিয়ে নেন। 

হেরাথ শ্রীলঙ্কার হয়ে ওয়ানডেতে ৭১ টি ম্যাচ খেলে ৭৪ টি উইকেট শিকার করেছেন (গড় ৩১.৯১), টি টুয়েন্টিতে দেশের জার্সিতে ১৭ ম্যাচে নিয়েছেন ১৮ উইকেট (গড় ২০.৭২)। ওয়ানডে ও টি টুয়েন্টিতে একদম আহামরি পারফরম্যান্স না করলেও টেস্টে তিনি তার মেধার উজ্জ্বল সাক্ষর রেখে গেছেন। ১৯৯৯ থেকে ২০১৮, দীর্ঘ ২০ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে মুরালিধরনের কারণে দলে নিয়মিত জায়গা না পেয়েও ৯৩ টি টেস্ট খেলেছেন, যেখানে তার সংগ্রহ ২৮.০৮ গড়ে ৪৩৩ উইকেট (৫ উইকেট ৩৪ বার, ১০ উইকেট ৯ বার)! এক নজরে দেখে নেই হেরাথের কিছু রেকর্ড -

★ টেস্টে বাঁহাতি বোলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি (৪৩৩ উইকেট)।

★ চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চসংখ্যকবার ৫ উইকেট শিকার (১২ বার)।

★ প্রথম লংকান বোলার হিসেবে টেস্টে হ্যাটট্রিক। 

★ একমাত্র বাঁহাতি বোলার হিসেবে এক ভেন্যুতে ১০০ টেস্ট উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব (গল, ১০২ উইকেট)।

★ মুরালিধরন ও স্টেইনের পর তৃতীয় বোলার হিসেবে সকল টেস্ট প্লেয়িং দেশের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট শিকার (বি. দ্র.- আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তান তখনও টেস্ট খেলার মর্যাদা পায়নি)।

★ দ্বিতীয় শ্রীলঙ্কান বোলার হিসেবে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১০০০ উইকেটের মাইলফলক অর্জন। 

মুরালির ছায়া হিসেবে থাকার সময়টায় ২২ টেস্টে ৩৭.৮৮ গড়ে নিয়েছিলেন ৭১ উইকেট, যেখানে মুরালিধরনের অবসরের পর ৭১ টি টেস্ট খেলে ২৬.১৫ গড়ে শিকার করেছেন ৩৬২ উইকেট! কে জানে হয়তো ভুল সময়ে জন্ম না নিলে গল্পটা অন্যরকমও হতে পারতো! টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হিসেবে হয়তো জ্বলজ্বল করতে পারতো রঙ্গনা হেরাথের নাম। এই 'হয়তো'র আক্ষেপটা না হয় শিকেয় উঠানো থাকুক, স্বমহিমায় উজ্জ্বল থাকুক রঙ্গনা হেরাথ।


ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া
৩য় ওয়ানডে, ক্যানবেরা
২ ডিসেম্বর ২০২০, সকাল ৯ঃ৪০
ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর, ২০২০/২১

ফরচুন বরিশাল বনাম বেক্সিমকো ঢাকা
৯ম ম্যাচ, মিরপুর, ঢাকা
২ ডিসেম্বর ২০২০, দুপুর ১ঃ৩০
বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপ, ২০২০

মিনিস্টার গ্রুপ রাজশাহী বনাম গাজী গ্রুপ চট্টগ্রাম
১০ম ম্যাচ, মিরপুর, ঢাকা
২ ডিসেম্বর ২০২০, সন্ধ্যা ৬ঃ৩০
বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপ, ২০২০

ওয়েষ্ট ইন্ডিজ বনাম নিউজিল্যান্ড
১ম টেষ্ট, হ্যামিল্টন
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ভোর ৪টা
ওয়েষ্ট ইন্ডিজের নিউজিল্যান্ড সফর, ২০২০

গল গ্ল্যাডিয়েটরস বনাম জাফনা স্টেলায়ন্স
৯ম ম্যাচ, হাম্বানটোটা
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, বিকাল ৪টা
এলপিএল, ২০২০

ডাম্বুলা ভাইকিংস বনাম ক্যান্ডি তুস্কার্স
১০ম ম্যাচ, হাম্বানটোটা
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, রাত ৮:৩০
এলপিএল, ২০২০
ইংল্যান্ড 9 উইকেটে জয়ী।
৩য় টি-টুয়েন্টি, কেপটাউন
দক্ষিন আফ্রিকা 191/3 (20.0)
ইংল্যান্ড 192/1 (17.4)
১ ডিসেম্বর ২০২০, রাত ১০টা
ইংল্যান্ডের দঃ আফ্রিকা সফর, ২০২০
জাফনা স্টেলায়ন্স 54 রানে জয়ী।
৮ম ম্যাচ, হাম্বানটোটা
জাফনা স্টেলায়ন্স 185/8 (20.0)
ক্যান্ডি তুস্কার্স 131/10 (17.1)
০১ ডিসেম্বর ২০২০, রাত ৮:৩০
এলপিএল, ২০২০
ডাম্বুলা ভাইকিংস 28 রানে জয়ী।
৭ম ম্যাচ, হাম্বানটোটা
ডাম্বুলা ভাইকিংস 175/9 (20.0)
কলম্বো কিংস 147/10 (18.4)
০১ ডিসেম্বর ২০২০, বিকাল ৪টা
এলপিএল, ২০২০
ক্যান্ডি তুস্কার্স 25 রানে জয়ী।
৬ষ্ঠ ম্যাচ, হাম্বানটোটা
ক্যান্ডি তুস্কার্স 196/5 (20.0)
গল গ্ল্যাডিয়েটরস 171/7 (20.0)
৩০ নভেম্বর ২০২০, রাত ৮:৩০
এলপিএল, ২০২০
জেমকন খুলনা 37 রানে জয়ী।
৮ম ম্যাচ, মিরপুর, ঢাকা
জেমকন খুলনা 146/8 (20.0)
বেক্সিমকো ঢাকা 109/10 (19.2)
৩০ নভেম্বর ২০২০, সন্ধ্যা ৬ঃ৩০
বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপ, ২০২০
জাফনা স্টেলায়ন্স 66 রানে জয়ী।
৫ম ম্যাচ, হাম্বানটোটা
জাফনা স্টেলায়ন্স 218/7 (20.0)
ডাম্বুলা ভাইকিংস 152/10 (19.1)
৩০ নভেম্বর ২০২০, বিকাল ৪টা
এলপিএল, ২০২০